তরুণ প্রজন্ম: শিক্ষিত বেকার, সম্ভাবনা এবং সমস্যা Learning View BD

 “আঠারো বছর বয়স যে দুর্বার

 পথে প্রান্তরে ছোটায় বহু তুফান”।

প্রবল ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, সমুদ্রের তুফানের মতো মানুষের কল্যাণে, বল-বীর্য, সাহস ও উদ্দীপনায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় তো শুধু মাত্র তরুণ দের মাঝেই দেখা যায়। সুতরাং তরুণ অর্থ হচ্ছে সাফল্যের সোপান। অর্থাৎ একটি দেশ যদি তরুণের উদ্দীপনাকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে সে দেশকে দাবায়ে রাখা কষ্টসাধ্য শুধু নয় একপ্রকার অসম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন তরুণদের সুযোগ ও সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া। এতক্ষন আমরা দেখলাম তরুণদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি, এ তরুণকে যদি সুযোগ না দেওয়া হয়, তাকে সুন্দর ভবিষ্যৎতের নিশ্চয়তা না দেয়া হয়, তাকে যদি বেকারত্ব এর অভিশাপ থেকে মুক্তি না দেওয়া হয় তাহলে আমরা তরুণকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখি আসলে তার বিপরীত অবস্থা হতে বিন্দুমাত্র দেরি হবে না। যে দেশের তরুণ থাকে হতাশাগ্রস্ত, সে দেশ কিভাবে আশার আলো নিজে দেখবে এবং অন্যকে দেখাবে! এ জন্য আমাদের প্রয়োজন তরুণকে বাঁচিয়ে রাখা, তাদের বেকারত্ব এর অভিশাপ হতে মুক্ত রাখা। কিভাবে তরুণদের এ অভিশাপ হতে মুক্ত করা যায় আজ তা নিয়ে কলম ধরলাম।

বর্তমানে কোভিড-১৯ পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে তার শক্তি। ফলস্বরূপ বিভিন্ন দেশের বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দেখা দিতে পারে চরম অর্থনৈতিক মন্দা। বাংলাদেশে এমনিতেই বেকারের সংখ্যা বেশি, তার উপর করোনা যেন আরও ভয়াবহতার আভাস দিচ্ছে। তাই আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

তথ্য ও প্রযুক্তি:

যুবকদের বেকারত্ব সমস্যা ও দূরীকরণের উপায়

বর্তমান তথ্য ও প্রযুক্তির যুগ। আশা রাখা যায় দিনে দিনে আইটির চাহিদা বাড়তেই থাকবে। আইটি সেক্টরের বিভিন্ন শাখা যেমন- নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডেটাবেজ ম্যানেজমেন্ট, এমআইএস, গ্রাফিক্স ডিজাইন, এস ই ও, এপ ডেভেলপমেন্ট, আউটসোর্সিং ইত্যাদি সেক্টর যেন সম্ভাবনার দুয়ার। কিন্তু আমাদের দেশে এর জন্য দক্ষ জনশক্তি নেই। আমরা যদি আইটি খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারি তাহলে প্রচুর কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে। আমাদের দেশে প্রচুর তরুণ বেকার অন্যদিকে আইটি খাত প্রচুর সম্ভাবনা নিয়ে বসে আছে, শুধু নেই পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন কর্মী। মানসম্পন্ন কর্মী তৈরির জন্য সরকারকে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে এই লকডাউনে অনেকেই বাসায় বসে অলস ভাবে দিন কাটাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিনামূল্যে অনলাইন কোর্স চালু করা যেতে,যাতে করে অনেকে আগ্রহী হইয়। আমাদের দরকার সঠিক ম্যানেজমেন্ট। সরকারি ভাবে যারা কোর্স করবে, সরকার ই তাদের আয়ের খাত তৈরি করে দেবে। যারা পারবে না তাদের পুনরায় আবার কোর্স করিয়ে দক্ষ করতে হবে। সবার পারসোনাল তথ্য সরকারের কাছে থাকতে হবে। এ জন্য সরকারকে আলাদা সেক্টর গঠন করতে হবে। একজন একাধিক কোর্স করতে পারবে না, তাহলে তারা যেকোন একটি বিষয়ে দক্ষ হতে পারবে। তাহলে ভবিষ্যতে আমরা তরুণ বেকারের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারবো।

কৃষিখাতঃ

তরুণ প্রজন্ম শিক্ষিত বেকার, সম্ভাবনা এবং সমস্যা

কৃষি নাম শুনলেই আমাদের ভিতর নেগেটিভ সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার চলে আসে। কিন্তু এই খাতে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বিশেষ করে বিভিন্ন খামার যেমন মাছ, গবাদি পশু ইত্যাদিতে খুলে যেতে বেকারের ভাগ্য। আমাদের গ্রামঞ্চলে রয়েছে এসব খামার তৈরির জন্য পর্যাপ্ত জমি। তরুণেরা বিভিন্ন শাকসব্জি, ফলমূলের আবাদ করে লাভবান হতে পারে। আসলে কৃষি নামের সাথে আমাদের বিরুপ মনোভাবের একটা কারণ রয়েছে। ধরুন একজন অনার্স করে গ্রামে যেয়ে কৃষি কাজ করলে তার আত্নীয় রাই তাকে নিয়ে উপহাস করবে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে টিভি বা অন্য মাধ্যমে কৃষি খাতের সুফল সম্পর্কে সকলকে বুঝাতে হবে। তরুণেরা যেন পড়া শেষ করেই কাজ করতে পারে এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে লোনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

ক্যারিয়ার গাইডঃ

আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গাইডলাইন নিয়ে কোনো ধারনা থাকে না। অনেকে জানেই না তারা তাদের সাবজেক্টে পড়াশুনা শেষে কি করবে, কি এর ভবিষ্যৎ? এ জন্য তারা তাদের বিষয়ে দক্ষ হতে পারে না। এ কারণে পাশ করার পর তারা জানে না তারা কি করবে! এ জন্য শিক্ষিত বেকারের হার বাড়ছেই। এ সমস্যা দূরীকরণে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার গাইডলাইনের জন্য মনিটরিং বিভাগ থাকতে হবে যারা হবে দক্ষ। কারণ তারা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ধারণা দেবে। অনেকে তার পছন্দনুযায়ী বিষয় না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ে, এ বিষয়েও তারা পরামর্শ দেবে যেন সে হতাশ না হয়ে সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারে।

কারিগরি শিক্ষাঃ

সরকারকে কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দিতে হবে। এতে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ধরুণ একজন অনার্স গ্রাজুয়েশন ছাত্রের প্রত্যাশা থাকবে ১ম শ্রেণীর কোনো জব করার। কিন্তু দেখা গেল ৪র্থ, ৫ম বা অন্য শ্রেণীর কাজের জন্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না। আবার অনার্স শেষ করা ছাত্র সেখানে এপ্লাই ই করছে না। অবশ্যই তারা ১ম,২য় শ্রেণীর চাকুরি করবে এবং অনার্স ও করবে। কিন্তু আমাদের মনোভাব এমন হয়েছে যে, যেভাবেই হোক অনার্স করতে হবে, ভার্সিটি লাইফ ছাড়া জীবন শেষ! আমাদের এ থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। এ জন্য সরকারের প্রতি আহবান কারিগরি শিক্ষার উপর নজর দেওয়া। কারিগরি মানে নিচু শ্রেনীর জব, এ ধারণা থেকে অভিভাবকদের দূর করতে হবে। তা ছাড়া ডিপ্লোমা শেষে কাজের পাশাপাশি বি এস সি করার সুযোগ সম্পর্কে তাদের বুঝাতে হবে।

শিক্ষাব্যবস্থাঃ  

আমি অনেক বড় এবং বিজ্ঞ নয় যে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বলবো কিন্তু তারপরেও কিছু বলতে হয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আসলে হ য র ল ব এর মতো। ধরা যাক না একটু বিসিএস এর কথা! বিসিএস দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সেক্টর। এ জন্য অনেকের স্বপ্ন থাকে বিসিএস ক্যাডার হবে। তাই সে যে বিষয়ে ই পড়ুক না কেন সে বাংলা,ইংরেজি,সাধারণ জ্ঞান মুখস্ত করতে ব্যস্ত থাকে। এতে সে তার মূল বিষয়ের জ্ঞান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এরপর যখন সে বিসিএস পেল না(সিট সংখ্যা যেহেতু অল্প) সে হয়ে যায় বেকার। এখন যে সে তার প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ের চাকুরি করবে সে সুযোগও সে হারিয়েছে। কারণ সে শুধু বিসিএসের পড়াই পড়েছে। এ জন্য বিসিএসে সকল সাবজেক্টের জন্য আলাদা ক্যাটাগরি থাকা প্রয়োজন। যেখানে তার প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ের উপর প্রশ্ন হবে। একজন মেডিকেল ছাত্র, সে কেন বাংলা সাহিত্য পড়বে! অথচ যার যার বিষয় রিলেটেড প্রশ্ন হলে সে বিসিএস না পেলেও অন্তত তার বিষয়ের উপর চাকুরি করতে পারবে। একজন সাহিত্যের ছাত্র, সে হচ্ছে ব্যাংকার, বাংলার ছাত্র সে হচ্ছে সফটওয়ার ডেভেলপার… এতে করে তরুণ বেকারের সংখ্যা বাড়ছেই।

দুর্নীতিঃ

দুর্নীতি একটি দেশকে কাঠে যেমন ঘুনি খায় তেমন দেশের মূল অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে যোগ্যরা চাকুরি পায় না। অযোগ্যরা দায়িত্বশীল পর্যায়ে থাকার কারণে তারা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে না। যোগ্যরা চাকুরি না পেয়ে হতাশ হয়ে আত্নহত্যার পথ বেছে নেয়। যেমন ধরুণ আজকের এই লেখা প্রতিযোগিতায় যদি যোগ্য ব্যক্তি সেরা না হয় তাহলে সে পরবর্তীতে লেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এভাবে তরুণ মেধাবীরা দুর্নীতির কবলে পড়ে হারিয়ে যায় ও দেশ হারায় তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। বিশেষ করে চাকুরি ক্ষেত্রে দুর্নীত, বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি করছে।

সুতরাং আসুন আমরা জাতির এই চরম দুর্দিনে সঠিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে তরুণদের বেকারের অভিশাপ হতে রক্ষা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাই।

কমেন্ট করুন

To be published, comments must be reviewed by the administrator *

পূর্ববর্তী পোস্ট পরবর্তি পোস্ট
Post ADS 1
Post ADS 1